হর্সশু কাঁকড়া পৃথিবীর একমাত্র দামি রক্তের প্রাণী।
বিজ্ঞান ও পরিবেশ ডেস্ক:
হর্সশু কাঁকড়া পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন প্রাণী। প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন বছর আগে তাদের উৎপত্তি, অর্থাৎ ডাইনোসরেরও বহু আগে। সময়ের পরীক্ষায় টিকে থেকে আজও তারা বেঁচে আছে। বিজ্ঞানীরা তাদের বলেন “লিভিং ফসিল” বা জীবন্ত জীবাশ্ম।
আসল কাঁকড়া নয়
নামের মধ্যে "কাঁকড়া" থাকলেও হর্সশু কাঁকড়া আসলে কাঁকড়া নয়। তারা সামুদ্রিক আর্থ্রোপড এবং মাকড়সা ও বিচ্ছুর মতো আরাকনিড গোষ্ঠীর কাছাকাছি। বর্তমানে পৃথিবীতে মাত্র চারটি প্রজাতি রয়েছে, যেগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আমেরিকার উপকূল ও মেক্সিকো উপসাগরে পাওয়া যায়।
নীল রক্তের রহস্য
মানুষের রক্ত লাল হয় লোহা-সমৃদ্ধ হিমোগ্লোবিনের কারণে। অন্যদিকে হর্সশু কাঁকড়ার রক্ত নীল, কারণ এতে থাকে তামাযুক্ত হিমোসায়ানিন। তাদের রক্তে থাকা বিশেষ কোষ আমিবোসাইট অতি সংবেদনশীল, যা ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস শনাক্ত করে জেলির মতো আবরণ তৈরি করে সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। এ কারণেই তাদের রক্ত থেকে তৈরি হয় LAL (Limulus Amebocyte Lysate), যা চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্তকরণ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন পরীক্ষায় অপরিহার্য।
এক লিটার হর্সশু কাঁকড়ার রক্তের দাম প্রায় ১৫ হাজার ডলার—যা এটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী তরল পদার্থে পরিণত করেছে।
নয়টি চোখ ও অদ্ভুত আচরণ
হর্সশু কাঁকড়ার শরীরে মোট নয়টি চোখ থাকে। এর মধ্যে দুটি যৌগিক চোখ সঙ্গী খুঁজতে সাহায্য করে, পাঁচটি সূর্যালোক শনাক্ত করে, আর বাকিগুলো সাঁতারের সময় দিক নির্ধারণে সাহায্য করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা প্রায়শই উল্টো হয়ে সাঁতার কাটে—যা শিকারি প্রাণী এড়ানোর একটি কৌশল।
প্রজনন ও জীবনচক্র
পূর্ণিমার রাতে বা উষ্ণ মৌসুমে মেয়েরা বালুকাবেলায় ডিম পাড়ে। একেকটি স্ত্রী কাঁকড়া প্রায় ৬০,০০০–১,২০,০০০ ডিম দেয়। অধিকাংশ ডিমই অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যে পরিণত হয়। কেবল অল্প কিছু ডিম থেকে বাচ্চা জন্ম নিয়ে বড় হয় এবং ৮–১০ বছরে পূর্ণবয়স্ক হয়।
মানুষের কারণে বিপন্ন
অর্ধ বিলিয়ন বছর ধরে টিকে থাকা এই প্রাণী আজ মানুষের কারণে বিপন্ন। চিকিৎসা শিল্পে অতিরিক্ত রক্ত সংগ্রহ, উপকূল ধ্বংস ও শিকার তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে। একসময় সার ও পশুখাদ্য তৈরিতেও ব্যবহৃত হতো।
তবে বিজ্ঞানীরা এখন বিকল্প উপায় খুঁজছেন—যাতে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী রক্তের এই আশ্চর্য প্রাণীগুলোকে রক্ষা করা যায়।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন